Breaking News
Home / Business / খেলাপি ঋণ ডেকে ঋণ দিয়ে বিপাকে ব্যাংক

খেলাপি ঋণ ডেকে ঋণ দিয়ে বিপাকে ব্যাংক

বরিশালের কাউনিয়া এলাকায় বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত সুগন্ধ্যা অ্যালুমিনিয়াম। মোস্তাফিজুর রহমানের মালিকানায় পরিচালিত এ কারখানায় প্রতি মাসে উৎপাদন হয় ৮ টন পণ্য। এ থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে প্রতিষ্ঠান ও পরিবারের খরচ মিটিয়ে ভালো সঞ্চয় থাকে। গত কয়েক বছরে কারখানা সম্প্রসারণ খাতে কোনো ব্যয়ও হয়নি। অথচ ২০১৭ সালে পূবালী ব্যাংকের বরিশাল নতুনবাজার শাখা সুগন্ধ্যা অ্যালুমিনিয়ামকে তিন কোটি টাকার ঋণ দেয়। পূবালী ব্যাংকের ঋণের টাকায় অন্য একটি ব্যাংকের আড়াই কোটি টাকার ঋণ সমন্বয় করেন মোস্তাফিজুর রহমান। বাকি ৫০ লাখ টাকা ব্যক্তিগত নানা কাজে ব্যয় করেন। এর আগেও ঋণের অধিকাংশ টাকা জমি ক্রয়সহ ব্যক্তিগত নানা কাজে ব্যয় করেন। প্রকৃত ব্যবসায়িক কাজে ব্যয় হবে না, এটা জেনেও এভাবে ঋণ দিয়েছে পূবালী ব্যাংক। সুগন্ধ্যা অ্যালুমিনিয়ামের পরিধি ছোট হওয়ায় ঋণের পরিমাণ কম। তবে অধিকাংশ বড় অনিয়মের গল্পের শুরুটাও হয় এভাবে। কোনো এলাকায় একটি নামকরা প্রতিষ্ঠান পেলে তাকে ঋণ দেওয়ার  জন্য হুমড়ি খেয়ে  পড়েন বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এই আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণেই খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এভাবে দেশের ভালো উদ্যোক্তা থেকে খেলাপিতে পরিণত হওয়ার অনেক উদাহরণ রয়েছে। দেশের শীর্ষ জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ লিমিটেড ও একসময়কার সেরা তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য আমদানিকারক ও পরিবেশক প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার সোর্স লিমিটেড (সিএসএল) এ ক্ষেত্রে বড় উদাহরণ। প্রতিষ্ঠান দুটির ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নিজেদের কাছে টাকার অভাব ছিল না। তারপরও তাদের ডেকে নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক কোটি কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। এই টাকা জমি ক্রয়সহ নানা খাতে আটকে গেছে। এখন ব্যাংক পড়েছে বিপাকে। এদিকে একসময়ের ভালো উদ্যোক্তা এখন বড় খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় উঠে এসেছে। এর মূল কারণ আগ্রাসী ব্যাংকিং। ভালো ও বড় গ্রাহক ধরতে গিয়ে অধিকাংশ সময় ব্যাংকগুলো সেধে সেধে ঋণ দিয়ে থাকে।

বেসরকরি খাতের মধুমতি ব্যাংকের এমডি মো. সফিউল আজম মনে করেন, ঋণ খারাপ হওয়ার অন্যতম একটি কারণ ব্যাংকগুলোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা। তিনি সমকালকে বলেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপি একটি শ্রেণি রয়েছে। এর বাইরে ঋণ খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ একই গ্রাহককে নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের মধ্যে টানাটানি। দেখা যায়, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে গ্রাহকের চাহিদা রয়েছে একশ’ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংক তাকে ৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে। তখন ঋণগ্রহীতা সঠিক কাজে না খাটিয়ে জমি ক্রয় বা অন্য খাতে ব্যয় করে আটকে যান। অভিজ্ঞ এ ব্যাংকার আরও বলেন, আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের এ প্রবণতা ব্যাংকগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। সমস্যার উত্তরণে ব্যাংকারদের উচিত সতর্ক হওয়া। সবাই একই গ্রাহকের পেছনে না ছুটে চিন্তাভাবনা করে এগোতে হবে। এ ধরনের প্রবণতা বন্ধে বেশ আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি নীতিমালা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে সে উদ্যোগ আর এগোয়নি। এ বিষয়ে একটি নীতিমালা থাকা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

ব্যাংকাররা জানান, কম্পিউটার সোর্স আমদানি করা প্রযুক্তি পণ্য বিক্রি করে প্রচুর নগদ টাকা পেত। ফলে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানটির ঋণের তেমন প্রয়োজন ছিল না। তারপরও বিভিন্ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিকে গ্রাহক বানিয়েছে। সহজ শর্তে দিয়েছে ঋণ। ফলে প্রতিষ্ঠানটি এই ঋণের টাকার সদ্ব্যবহার করেনি। অতি সহজে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে পাওয়া ঋণের একটি অংশ সিঙ্গাপুরে পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় জমি কিনেছে এ প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে জমির দাম পড়ে যাওয়ায় কম্পিউটার সোর্স এখন ব্যাংক খাতের অন্যতম খেলাপি। পাঁচটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ রয়েছে ২৮৪ কোটি টাকা। এক খাতের নামে ঋণ নিয়ে অন্য খাতে ব্যবহার করে একপর্যায়ে তিনি ঋণখেলাপিতে পরিণত হন। শাখা কর্মকর্তারা জেনেও প্রধান কার্যালয় থেকে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য সক্ষমতার চেয়ে বেশি ঋণ দেন।

১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আনন্দ শিপইয়ার্ডে প্রথম বড় অর্থায়ন করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির মূলধন ভিত্তি ভালো হওয়ায় অর্থায়নে সমস্যা ছিল না। আবার যেসব বিদেশি প্রতিষ্ঠান জাহাজ কিনত, তাদের অনেকে আনন্দকে অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখত। এরপরও কয়েকটি ব্যাংক কম সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার জন্য বারবার আনন্দের কাছে হাজির হয়। একপর্যায়ে এই শিপইয়ার্ডের মালিক একই জাহাজের বিপরীতে একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেন। পরে ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজের মূল্য ব্যাপকভাবে কমে যায়। বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান জাহাজ কেনার চুক্তি বাতিল করে। এতে ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে না পেরে খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন।

আনন্দ শিপইয়ার্ড বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের পাওনা রয়েছে ৬৪৪ কোটি টাকা। খেলাপি হয়ে যাওয়া এ অর্থ আদায়ে ২০১৫ সালে মামলাসহ বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করেও তা আর আদায় হয়নি। এ ছাড়া জনতা ব্যাংকে ২৩৮ কোটি, ওয়ান ব্যাংকে ২২৭ কোটি, এবি ব্যাংকে ১৫৩ কোটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে ২৪ কোটি ও এনসিসি ব্যাংকে ১৬ কোটি টাকাসহ কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুদে-আসলে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার খেলাপি। ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে না পারলেও আনন্দ শিপইয়ার্ডের মালিক প্রকৌশলী আব্দুল্লাহেল বারী ও আফরোজা বারী দম্পতি গাজীপুরের টঙ্গীতে ৯ একর জমির ওপর একটি বিলাসবহুল বাড়ি করেছেন। যেখানে সুইমিং পুল, হেলিপ্যাডসহ রয়েছে নানা আধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত।

সংশ্নিষ্টরা জানান, সব ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে শাখাগুলোকে আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ আদায়সহ বিভিন্ন বিষয়ে একটি লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, পদায়নের ক্ষেত্রে এসব লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বিষয়টি দেখা হয়। ফলে দুর্নীতিবাজ নন, এ রকম কর্মকর্তাও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মরিয়া হয়ে ওঠেন। ঝামেলা বিবেচনায় নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ না দিয়ে, যারা বড় ব্যবসায়ী তাদেরকে গ্রাহক করতে পিছু নেন। এতে করে অর্থায়নের অভাবে একদিকে নতুন উদ্যোক্তা গড়ে ওঠে না। আবার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি টাকা পেয়ে স্বভাবজাতভাবে বিলাসিতায় জীবন কাটাতে শুরু করেন। অনেক ক্ষেত্রে উৎকোচের বিনিময়ে খারাপ ব্যবসায়ী জেনেও ঋণের ব্যবস্থা করে দেন ব্যাংকার। অবশ্য বড় ঋণে শাখা কর্মকর্তা ছাড়াও প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের যোগসাজশ থাকে। কেননা এসব পর্যায়ের অনুমোদন ছাড়া বড় ঋণ অনুমোদন হয় না।

লিংক কম্পিউটার যশোর এর বিজ্ঞাপন

About বাংলা ভোর

সবার আগে আমরা

Check Also

কাঙ্ক্ষিত ফল নেই অর্থনীতিতে

পণ্যবাজার, মুদ্রাবাজার কিংবা শেয়ারবাজার- সবখানেই সরকারের পক্ষ থেকে কিছু প্রণোদনা রয়েছে। প্রণোদনা রয়েছে কৃষিতে, রয়েছে …